Swami Vivekananda (স্বামী বিবেকানন্দ)

PAGE AT A GLANCE (পৃষ্ঠা একনজরে)  
1) আবির্ভাব, শৈশব ও ছাত্রজীবন 5) ভারতে প্রত্যাবর্তন ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা
2) শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে  6) সংক্ষিপ্ত জীবনীপঞ্জী
3) পরিব্রাজক  7) অমৃতবাণী
4) বিদেশে  

 

 

  আবির্ভাব, শৈশব ও ছাত্রজীবন

উনিশ শতকের ভারতের নবজাগরণের অন্যতম পুরোধাপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)। আধুনিক ভারতের স্রষ্টা  রূপে তাঁকে চিহ্নিত করেছেন অনেকে। শুধু ভারতবর্ষ নয়, সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন আত্মবিশ্বাসের মন্ত্রে, যার ভিত্তি নিহিত আছে ভারতের সনাতন আধ্যাত্মিকতায়, ‘সোহহম্’ এইভাবে। তাঁর গুরুদেব  শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে শেখা ‘যত মত তত পথ’ আর ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র বাণী পৌঁছে দিয়েছেন দেশ-কালের গন্ডি ছাড়িয়ে, চিরকালীন মানুষের কাছে। ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের ১২ই জানুয়ারী (বাংলা ১২৬৯, ২৯শে পৌষ) কৃষ্ণা সপ্তমী তিথিতে মকর সংক্রান্তির দিনে সূর্যোদয়ের ছ’মিনিট আগে  (সকাল ৬টা ৩৩ মিনিট)  নরেন্দ্রনাথের জন্ম যেন ভারতবর্ষের নতুন সূর্যোদয়কে নির্ণীত করে দিয়েছিল। তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতার সিমলাপল্লীতে (Simla, Kolkata) বিশ্বনাথ দত্ত ও ভুবনেশ্বরী দেবীর প্রথম পুত্র রূপে তাঁর আর্বিভাব। পিতা বিশ্বনাথ দত্ত পেশায় এটর্নি। সাতটি ভাষায় দক্ষ। ইতিহাস ও সঙ্গীতে উৎসাহী। মাও ছিলেন একাধারে তেজস্বিনী ও ভক্তিমতি, অভিজাত ও দয়ালু, ইংরাজীতে পারদর্শী। কাশীর বীরেশ্বর শিবের কাছে প্রার্থনা করে পুত্র লাভ করায় ভুবনেশ্বরী দেবী নাম রেখেছিলেন বীরেশ্বর। সম্ভ্রান্ত, উদারচেতা, দত্তপরিবারে সন্তানের সামগ্রিকভাবে বেডে ওঠার বন্দোবস্ত ছিল চমৎকার। পড়াশুনো, খেলাধুলা, ব্যায়াম, কবিতা-গান, সর্বোপরি স্বাধীন চিন্তায় উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল ছোট থেকেই। শিশু বিলে বিভিন্ন জাতের জন্য রাখা হুঁকোয় টান দিয়ে বুঝে নিতে চায় জাত কোথা থেকে যায়। সঙ্গীকে ঘোড়ার গাড়ীর তলা থেকে বাঁচাতে নিজের বিপদ তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবার গোরা সিপাইদের ভয় না পেয়ে ইংরাজিতে বুঝিয়ে বলে যে তার বন্ধুদের মাঝিরা নৌকায় আটকে রেখেছে। তাদের সাহায্যে বন্ধুদের ঘাটে নামার ব্যবস্থা করে। সিরাপিস রণতরী দেখার অনুমতি আদায়ের সময় বড় সাহেবের দারোয়ান ছোট বালককে গুরুত্ব না দিয়ে ফেরত পাঠাতে চাইলে নরেন পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে অনুমতি আদায় করে। দুষ্টু বিলেকে মা ঘরে আটকালে সে জানালা দিয়ে দরিদ্রদের পোশাক-আশাক দিয়ে দেয়। আবার মাথায় জল ঢেলে ‘শিব’ ‘শিব’ বললে সেই দুরন্ত বালকই নিমেষে শান্ত হয়ে যায়। শয়নকালে দর্শন করে জ্যোতি। ১৮৭১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে নবম শ্রেণীতে (বর্তমান ২য় শ্রেণী) ভর্তি হল নরেন্দ্রনাথ। স্বীয় প্রতিভার অলোকসামান্য ছটার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ছোট থেকেই। স্কুলের বিতর্ক ও আলোচনা সভায় সেই মধ্যমণি। বাড়িতে বানায় ব্যয়ামাগার,  তৈরী করে থিয়েটারের দল। খেলাধূলায় পরিচালক নেতা। রাগপ্রধান সঙ্গীত ও ভজনে পারদর্শী। নাটকের কুশলী অভিনেতা। লাঠিখেলা, অসিচালনা, ঘোড়ায় চড়া, নৌকা বাওয়া, সাঁতার, কুস্তি আর জিমন্যাস্টিকে তাঁর ভীষণ উৎসাহ। যোগ দেয় নবগোপাল মিত্রের ব্যায়ামাগারে। বক্সিং প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে রুপোর প্রজাপ্রতি পুরস্কার পায়। ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করে নরেন্দ্রনাথ ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রথম বছরের শেষে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বহুদিন শয্যাশায়ী থাকার পরে ভর্তি হন জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশনে (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ, Scottish Church College) এবং ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে এই কলেজ থেকেই এফ. এ. (ফার্স্ট আর্টস) পাশ করেন।

শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে

নরেন্দ্রনাথ তাঁর কলেজের  অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টির কাছে শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধির বিষয় শোনেন ও ১৮৮১–র নভেম্বরে সুরেন মিত্রের বাড়িতে প্রথমবার শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তাঁর কন্ঠে অযোধ্যানাথ পাকড়াশী লিখিত ‘মন চল নিজ নিকেতনে’ গানটি শুনে শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবস্থ হয়ে যান। ১৮৮১–র ডিসেম্বরে নরেন্দ্রনাথ প্রথম বার আসলেন দক্ষিণেশ্বরের (Dakshineswar) কালীমন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক নরেন্দ্রনাথ আসলেন বহু ধর্মমতের সাধনায় সিদ্ধ প্রাচ্য ঋষির কাছে। জীবনজিজ্ঞাসা ও সংশয়ের নিরসনে, ঈশ্বরের খোঁজে। পেশাদারী শিক্ষানবিশীর পাঠ নিতে এঙ্কার অ্যান্ড হোপ লজে ফ্রি ম্যাসন হয়ে যোগ দেন ও সসস্মানে উত্তীর্ণ হন। ১৮৮৪ সালের ২৫শে ফ্রেব্রুয়ারী রাতে পিতা পরলোক গমন করেন। এতদিনের সযত্নলালিত অভিজাত পরিবারের সন্তান তীব্র আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়লেন। শ্রীরামকৃষ্ণের আদেশে আর্থিক অভাবমোচনের প্রার্থনার জন্য শ্রীশ্রীকালীমায়ের নিকট তিনবার চেষ্টা করেও টাকা-পয়সা চাইতে পারলেন না। পরিবর্তে প্রার্থনা করলেন বিবেক-বৈরাগ্য-জ্ঞান ও ভক্তি। এটর্নি অফিসে কাজ করে ও বই অনুবাদ করে সংসার যাত্রা নির্বাহ করলেও তাঁর মন তখন পড়ে আছে শ্রীরামকৃষ্ণের পদপান্তে। শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসার সুবিধার্থে তাঁকে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে (Cossipore Udyanbati) এনে রাখা হয়েছিল। সেখানেই ১৮৮৬–র সম্ভবত ৯ই জানুয়ারি শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথ সহ এগার জন ত্যাগী শিষ্যের হাতে তুলে দিলেন বুড়ো গোপালের আনা গেরুয়া বস্ত্র ও রুদ্রাক্ষের মালা। বললেন,  ‘আমার এই যুবক সেবকেরা প্রত্যেকে হাজারি সাধু, প্রত্যেকে হাজার সাধুর সমান’। উত্তরকালের লোকশিক্ষক রূপে নরেন্দ্রনাথকে চিহ্নিত করে চাপরাস লিখে দেন “নরেন শিক্ষে দেবে”। ঐ বাড়ির একতলার ডানদিকের ঘরে ১৮৮৬–র মার্চের শেষ সপ্তাহে নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন। ১৮৮৬–র ১৬ই আগস্ট ঠাকুরের মহাসমাধির পর নরেন্দ্রনাথ গুরুভাইদের নিয়ে বরাহনগরের একটি পুরনো ভাঙ্গাবাড়িতে প্রথম রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্টা করেন। ১৮৮৭র জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে বরাহনগর মঠে বিরজা হোম অন্তে আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস নেন নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর কয়েকজন গুরুভাই। নরেন্দ্রনাথের সন্ন্যাস নাম হয় বিবিদিষানন্দ। নবীন সন্ন্যাসীবৃন্দ চরম দারিদ্রের মধ্যেও ডুবে থাকতেন গভীর সাধনা ও অধ্যয়নে।

পরিব্রাজক

১৮৮৭র গ্রীষ্মকালে অসুস্থতার পর শিমূলতলা ও বৈদ্যনাথধাম গেলেন স্বামীজি। কাশী দর্শনান্তে ফিরে আসলেন বরাহনগর মঠে। কিছুদিন পরে আবার গেলেন কাশী। সেখান থেকে অযোধ্যা, লখনৌ, আগ্রা। 

বৃন্দাবন-হরিদ্বার-ঋষিকেশ হয়ে হাতরাসে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়লেন ও বরাহনগর মঠে ফি

রে আসলেন ১৮৮৮র শেষ দিকে। ১৮৮৯ র ডিসেম্বরের শেষে বৈদ্যনাথধাম যাত্রা করলেন। সেখান থেকে গেলেন এলাহাবাদ, গাজীপুর, কাশী। গাজীপুরে পওহারীবাবার সান্নিধ্যে এসে তাঁর কাছে রাজযোগ শিক্ষার কথা ভাবলেও শিষ্যত্ব গ্রহণের পূর্বরাত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ মূর্তি দর্শন করে সে সঙ্কল্প ত্যাগ করেন। ১৮৯০র ১৩ই এপ্রিল বলরাম বসুর মৃত্যু হয়। সংবাদ পেয়ে কলকাতায়  ফিরলেন। ফের ৩রা আগস্ট বেরিয়ে পরিব্রাজক সন্ন্যাসী চললেন ভাগলপুর-বৈদ্যনাথ–গাজীপুর-কাশী-অয্যোধ্যা-নৈনিতাল-আলমোরা-মীরাট-দিল্লী হয়ে রাজপুতানার পথে, পশ্চিমভারত হয়ে শেষে দক্ষিণভারতে। ভারতপথিক সন্ন্যাসী ভারতের জনজীবনের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এলেন। দরিদ্রের কুটিরে নিহিত ভারতের প্রাণস্পন্দন অনুভব করলেন। শুনতে পেলেন আধ্যাত্মিকতার অন্তঃসলিলা মূলস্রোতের কলতান। সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি তুলে ধরলেন সনাতন ধর্মের মূলবাণী। তাঁর ব্যক্তিত্ব, প্রতিভা ও পবিত্রতায় অভিভূত, গুণমুগ্ধ হলেন কত রাজা-পন্ডিত-সমাজ সংস্কারক। বিভিন্ন স্থানে ‘বিবিদিষানন্দ’, ‘বিবেকানন্দ’, ‘সচ্চিদানন্দ’, এমন নানা নামে নিজের পরিচয় দেন তিনি। দক্ষিণভারতের যুবকেরাও সমাজের বিভিন্ন স্তরের গুণমুদ্ধ বিশিষ্টজনেরা স্বামীজীকে শিকাগো (Chicago) ধর্মসভায় যোগদানের আনুরোধ জানালেন।

বিদেশে

শ্রী শ্রী মায়ের অনুমতি পেয়ে ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে ৩১শে মে বোম্বে থেকে  ‘পেনিনসুলা’ জাহাজে চেপে রওনা দিলেন বিবেকানন্দ। কলম্বো-মালয়-সিঙ্গাপুর-হংকং হয়ে কোবিতে জাহাজ থেকে নেমে স্থলপথে জাপানের কিছু শহর দেখে নিলেন। ইয়াকোহামা থেকে ‘এম্প্রেস অফ ইন্ডিয়া’ জাহাজে চেপে ভ্যাঙ্কুবারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ভ্যাঙ্কুবার পৌঁছে সেখান থেকে ট্রেনে পৌঁছালেন শিকাগোয়। প্রাথমিক অপরিচিতি ও প্রতিকূলতা যেন দৈবাৎ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের সঙ্গে পরিচয়ে কেটে গেল। অধ্যাপক রাইট স্বামীজীর সূর্যসঙ্কাশ পন্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে ধর্মসভায় যোগদানের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ডঃ ব্যারোজকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখলেন। ১১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ধর্মমহাসভায় স্বামীজী ছয়টি বক্তৃতা দেন। প্রারম্ভিক ‘আমেরিকার ভাই-বোনেরা’ সম্ভাষণে এক অভূতপূর্ব আবেগ ও অভিনন্দনের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিলেন শ্রোতারা। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পান্ডিত্যের পরিচয়ে আমেরিকার নাগরিক সমাজ যে ভাবে প্রভাবিত ও আপ্লুত হয়েছিল, তার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে সমকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্র ও গুণমুগ্ধ, বিশিষ্টজনেদের স্মৃতিচারণায়।

আমেরিকার বিভিন্ন শহরে বক্তৃতা করার পর ১৮৯৫ –এর ১৮ই জুন থেকে ৬ই আগস্ট স্বামীজী তাঁর বারো জন শিষ্য-শিষ্যাকে থাউজ্যান্ডে আইল্যান্ড পার্কে শোনালেন ধর্মসাধনার নিগুঢ় পদ্ধতি। পরে প্যারিস, লন্ডন হয়ে ৬ই ডিসেম্বর ফের নিউইয়র্কে আসেন। বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে ১৮৯৬ –এর ১৬ই এপ্রিল লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ড-ইটালি-জার্মানী-হল্যান্ড হয়ে ফের লন্ডনে বেদান্ত প্রচার করলেন। ১৬ই ডিসেম্বর ট্রেনে চেপে মিলান-পিসা-রোম দেখে এসে পৌঁছালেন নেপলসে। সেখানে থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে জাহাজে চাপলেন ৩০শে ডিসেম্বর।

ভারতে প্রত্যাবর্তন ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা

১৮৯৭ –র ১৫ই জানুয়ারী স্বামীজী কলম্বো এসে পৌঁছালেন। পাশ্চাত্যে তাঁর অভাবনীয় সাফল্য পরাধীন জাতির আত্মমর্যাদাকে জাগ্রত করেছিল। ঐতিহাসিক ও আন্তরিক গণ অভিনন্দনে দেশবাসী তাঁকে বরণ করে নেয়। তবে অতিরিক্ত পরিশ্রম ও আপ্যায়নের অত্যাচারে তাঁর অসুস্থ শরীর আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। অভিনন্দনের উত্তরে দেওয়া তাঁর বক্তৃতাগুলিতে স্বামীজী নতুন ভারবর্ষের পুনর্গঠনের দিকনির্দেশ করেন। পুনর্সিঞ্চন করেন সনাতন ধর্মের সঞ্জীবনী সুধা। ১৮৯৭ –এর ১লা মে রামকৃষ্ণ মিশনের (Ramakrishna Mission) আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা করলেন। আলমোড়া-বেড়িলী-আম্বালা-অমৃতসর-শ্রীনগর-রাওয়ালপিন্ডি-লাহোর-দেরাদুন-আলোয়াড়-খেতড়ি ঘুরে ১৮৯৮ –এর ১৫ই জানুয়ারী যখন কোলকাতায় ফিরলেন তখন তিনি অসুস্থ। এক মাস দার্জিলিংএ বিশ্রাম নেওয়ার পর আলমোড়া – কাশ্মীর – অমরনাথ – ক্ষীরভবানী হয়ে ১৮ অক্টোবর কোলকাতায় ফিরে আসেন। ঐ বছর ৯ই ডিসেম্বর বেলুড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ (Belur Math) স্থাপন করেন ও সঙ্ঘের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্দেশ করে দেন – “বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়” – “আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’’। ১৮৯৯ –র ২০শে জুন দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। ইংল্যান্ড – আমেরিকা – প্যারিস – ভিয়েনা – কনস্টান্টিনোপোল – এথেন্স – মিশর হয়ে ১৯০০ –র ৯ই ডিসেম্বর মঠে ফিরে আসেন। এই পর্বে ৯০টিরও বেশী বক্তৃতা দেওয়ার সাথে সাথে, ঐ দেশগুলিতে যে কর্মকান্ডের পত্তন করেছিলেন খতিয়ে দেখেন তাও। দেশে ফিরে মায়াবতী, ঢাকা, কামাখ্যা, শিলং, বুদ্ধগয়া ও কাশীতে গিয়েছিলেন। ১৯০২ –এর ৪ঠা জুলাই শুক্রবার রাত ৯টা ১০ মিনিটে স্বামীজী বেলুড় মঠে নিজের ঘরে মহাসমাধিতে বিলীন হন।

স্বামী বিবেকানন্দের জীবন, বাণী ও আদর্শকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মানুষ বহুবিধ মানবকল্যাণের কর্মকান্ডে ব্রতী রয়েছেন। নিজেই তিনি বলেছিলেন ‘আমরণ কাজ করে যাও – আমি তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছি, আর আমার শরীর চলে গেলেও আমার শক্তি তোমাদের সঙ্গে কাজ করবে’।

 

 

 

সংক্ষিপ্ত জীবনীপঞ্জী

১৮৬৩  ১২ই জানুয়ারী -(বাংলা ১২৬৯, ২৯শে পৌষ) কৃষ্ণা সপ্তমী তিথিতে মকর সংক্রান্তির দিনে সূর্যোদয়ের ছ’মিনিট আগে  (সকাল ৬টা ৩৩ মিনিট)  জন্ম ।

১৮৭১ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে নবম শ্রেণীতে (বর্তমান ২য় শ্রেণী) ভর্তি ।

১৮৭৯ এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করে নরেন্দ্রনাথ ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রথম বছরের শেষে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বহুদিন শয্যাশায়ী থাকার পরে ভর্তি হন জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশনে (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ, Scottish Church College)।

১৮৮১  জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন  থেকে এফ এ (ফার্স্ট আর্টস) পাশ করেন। ঐ বছর নভেম্বরে সুরেন মিত্রের বাড়িতে প্রথমবার শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ডিসেম্বরে নরেন্দ্রনাথ প্রথম বার আসলেন দক্ষিণেশ্বরের (Dakshineswar) কালীমন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে।

১৮৮৪  ২৫শে ফ্রেব্রুয়ারী রাতে পিতা পরলোক গমন করেন।

১৮৮৬ সম্ভবত ৯ই জানুয়ারি শ্রীরামকৃষ্ণ কাশীপুর উদ্যানবাটিতে (Cossipore Udyanbati) নরেন্দ্রনাথ সহ এগার জন ত্যাগী শিষ্যের হাতে গেরুয়া বস্ত্র ও রুদ্রাক্ষের মালা তুলে দিয়েছিলেন।  মার্চের শেষ সপ্তাহে উদ্যানবাটিতে একতলার ডানদিকের ঘরে নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন। ১৬ই আগস্ট ঠাকুরের মহাসমাধি ।

১৮৮৭ জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে বরাহনগর মঠে বিরজা হোম অন্তে আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস নেন নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর কয়েকজন গুরুভাই। নরেন্দ্রনাথের সন্ন্যাস নাম হয় বিবিদিষানন্দ।

১৮৮৭ গ্রীষ্মকালে অসুস্থতার পর শিমূলতলা ও বৈদ্যনাথধাম গেলেন স্বামীজি। কাশী দর্শনান্তে ফিরে আসলেন বরাহনগর মঠে।

১৮৮৮ কাশী-অযোধ্যা-লখনৌ-আগ্রা-বৃন্দাবন-হরিদ্বার-ঋষিকেশ হয়ে হাতরাসে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়লেন ও বরাহনগর মঠে ফিরে আসলেন  ১৮৮৮ র শেষ দিকে।

১৮৮৯  ডিসেম্বরের শেষে বৈদ্যনাথধাম যাত্রা করলেন। সেখান থেকে গেলেন এলাহাবাদ, গাজীপুর, কাশী।

১৮৯০ ১৩ই এপ্রিল বলরাম বসুর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে কলকাতায়  ফিরলেন। ফের ৩রা আগস্ট বেরিয়ে, চললেন ভাগলপুর-বৈদ্যনাথ–গাজীপুর-কাশী-অয্যোধ্যা-নৈনিতাল-আলমোরা-মীরাট-দিল্লী হয়ে রাজপুতানার পথে, পশ্চিমভারত হয়ে শেষে দক্ষিণভারতে।

১৮৯৩  ৩১শে মে বোম্বে থেকে  ‘পেনিনসুলা’ জাহাজে চেপে রওনা দিলেন আমেরিকার উদ্দেশ্যে। কলম্বো-মালয়-সিঙ্গাপুর-হংকং হয়ে জাপানের কোবিতে জাহাজ থেকে নেমে স্থলপথে জাপানের কিছু শহর দেখেন। জাপানের ইয়াকোহামা থেকে ‘এম্প্রেস অফ ইন্ডিয়া’ জাহাজে চেপে কানাডার ভ্যাঙ্কুবারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ভাঙ্কুবার থেকে ট্রেনে করে পৌঁছালেন শিকাগোয়। ১১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ধর্মমহাসভায় স্বামীজী ছয়টি বক্তৃতা দেন।

১৮৯৫ ১৮ই জুন থেকে ৬ই আগস্ট স্বামীজী তাঁর বারো জন শিষ্য-শিষ্যাকে থাউজ্যান্ডে আইল্যান্ড পার্কে শেখালেন ধর্মসাধনার নিগুঢ় পদ্ধতি। পরে প্যারিস, লন্ডন হয়ে ৬ই ডিসেম্বর ফের নিউইয়র্কে আসেন।

 ১৮৯৬ বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে ১৬ই এপ্রিল লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ড-ইটালি-জার্মানী-হল্যান্ড হয়ে ফের লন্ডনে বেদান্ত প্রচার করলেন। ১৬ই ডিসেম্বর ট্রেনে চেপে মিলান-পিসা-রোম দেখে এসে পৌঁছালেন নেপলসে। সেখানে থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে জাহাজে চাপলেন ৩০শে ডিসেম্বর।

১৮৯৭  ১৫ই জানুয়ারী স্বামীজী কলম্বো এসে পৌঁছালেন। ঐতিহাসিক ও আন্তরিক গণ অভিনন্দনে দেশবাসী তাঁকে বরণ করে নেয়। অভিনন্দনের উত্তরে দেওয়া তাঁর বক্তৃতাগুলিতে স্বামীজী নতুন ভারবর্ষের পুনর্গঠনের দিকনির্দেশ করেন।

১৮৯৭ –এর ১লা মে রামকৃষ্ণ মিশনের (Ramakrishna Mission) আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা করলেন।

১৮৯৮ –এর ১৫ই জানুয়ারী আলমোড়া-বেড়িলী-আম্বালা-অমৃতসর-শ্রীনগর-রাওয়ালপিন্ডি-লাহোর-দেরাদুন-আলোয়াড়-খেতড়ি ঘুরে  কোলকাতায় ফিরলেন।

এক মাস দার্জিলিং-এ বিশ্রাম নেওয়ার পর আলমোড়া – কাশ্মীর – অমরনাথ – ক্ষীরভবানী হয়ে ১৮ অক্টোবর কোলকাতায় ফিরে আসেন। ঐ বছর ৯ই ডিসেম্বর বেলুড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ (Belur Math) স্থাপন করেন ও সঙ্ঘের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্দেশ করে দেন – “বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়” – “আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’’।

১৮৯৯ ২০শে জুন দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

১৯০০  ইংল্যান্ড – আমেরিকা – প্যারিস – ভিয়েনা – কনস্টান্টিনোপোল – এথেন্স – মিশর হয়ে ৯ই ডিসেম্বর বেলুড় মঠে ফিরে আসেন।

১৯০২  ৪ঠা জুলাই শুক্রবার রাত ৯টা ১০ মিনিটে স্বামীজী বেলুড় মঠে নিজের ঘরে মহাসমাধিতে বিলীন হন।।

 

অমৃতবাণী

অভ্যাস

চরিত্র গঠনের জন্য ধীর ও অবিচলিত যত্ন, এবং সত্যকে উপলব্ধি করার তীব্র প্রচেষ্টাই শুধু মানবজাতির ভবিষ্যৎ জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনচর্যা

সাহস অবলম্বন কর, ভয় পেয়ো না। ...আমাদের ‘অভীঃ’ – নির্ভীক হতে হবে, তবেই আমরা কাজে সিদ্ধিলাভ করবো; ওঠো- জাগো, কারণ তোমাদের মাতৃভূমি এই মহাবলি প্রার্থনা করছেন।

আমাদের দেশের পক্ষে এখন প্রয়োজন- লোহার মতো দৃঢ় পেশী ও ইস্পাতের মতো স্নায়ু; এমন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি চাই, কেউই যেন তাকে প্রতিরোধ করতে সমর্থ না হয়, তা যেন ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত রহস্য ভেদ করতে সমর্থ হয় – যদি এই কাজ করতে গিয়ে সমুদ্রের গভীরে যেতে হয়, যদি বা সর্বদা সর্বপ্রকার মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়! এটাই এখন আমাদের দরকার। 

প্রত্যেক ব্যক্তির অপর ব্যক্তিকে ... ঈশ্বর বলে চিন্তা করা উচিত  ও তার সঙ্গে তেমন ভাবে ব্যবহারও করা উচিত, কাউকে ঘৃণা করা বা কোনভাবে কারও নিন্দা বা অনিষ্ট করা উচিত নয়। আর এ যে শুধু সন্ন্যাসীর কর্তব্য তা নয়, সব নর-নারীরই কর্তব্য।

সত্যের জন্য সব কিছুকেই ত্যাগ করা চলে, কিন্তু কোন কিছুরই জন্য সত্যকে বর্জন করা চলে না। সত্যের অনুসন্ধান মানে শক্তির প্রকাশ – এটা দুর্বল বা অন্ধের মতো হাতড়ানো নয়।

কোন বিষয় সত্য কি অসত্য –জানতে হলে তার অব্যর্থ পরীক্ষা এই - তা তোমাকে শারীরিক মানসিক বা আধ্যাত্মিক ভাবে দুর্বল করে কি না; যদি করে তবে তা বিষবৎ পরিহার কর, তাতে প্রাণ নেই, তা কখনও সত্য হতে পারে না। সত্য বলপ্রদ, সত্যই পবিত্রতা –বিধায়ক, সত্যই জ্ঞানস্বরূপ।  

ত্যাগ

ওঠো, জাগো, যতদিন না লক্ষ্যে পৌঁছচ্ছ, ততদিন নিশ্চিন্ত থেকো না; ওঠো, আর একবার ওঠো, ত্যাগ ছাড়া কিছুই হতে পারে না। অন্যকে যদি সাহায্য করতে চাও, তবে তোমার নিজের ‘অহং’ ত্যাগ করতে হবে।

শ্রদ্ধা

আমি চাই-এই শ্রদ্ধা। আমাদের সবারই প্রয়োজন- এই আত্মবিশ্বাস। ... আমাদের জাতীয় শোণিতে এক ভয়ানক রোগের বীজ প্রবেশ করছে –সব বিষয় হেসে উড়িয়ে দেওয়া, গাম্ভীর্যের অভাব। এই দোষটি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে হবে। বীর হও, শ্রদ্ধাসম্পন্ন হও, আর যা কিছু সব আসবেই আসবে।

বিশ্বাস

বিশ্বাস, বিশ্বাস, বিশ্বাস- নিজের উপর বিশ্বাস – ঈশ্বরে বিশ্বাস – উন্নতি লাভের এই একমাত্র উপায়।

তুমি যা চিন্তা করবে, তাই হয়ে যাবে। যদি তুমি নিজেকে দুর্বল ভাবো, তবে দুর্বল হবে। তেজস্বী ভাবলে তেজস্বী হবে।

ব্যর্থতা, ভুল থাকলই বা; গরুকে কখনও মিথ্যা বলতে শুনিনি, কিন্তু সে চিরকাল গরুই থাকে, কখনও মানুষ হয় না। অতএব বারবার বিফল হও, কিছুমাত্র ক্ষতি নেই; হাজারবার ঐ আদর্শ হৃদয়ে ধারণ কর, আর যদি হাজারবার অকৃতকার্য হও, আর একবার চেষ্টা করে দেখ। 

জীবনের পরম সত্য এই-  শক্তিই সুখ ও আনন্দ, শক্তিই অনন্ত ও অবিনশ্বর জীবন; দুর্বলতাই অবিরাম দুঃখ ও উদ্বেগের কারণ; দুর্বলতাই মৃত্যু।

সকলকে গিয়ে বল- ‘ওঠো, জাগো, আর ঘুমিও না; সকল অভাব, সকল দুঃখ ঘুচাবার শক্তি তোমাদের নিজের ভিতর রয়েছে, একথা বিশ্বাস করো, তাহলেই ঐ শক্তি জেগে উঠবে।’

 

Ramakrishna Mission Vivekananda University
Belur Math, Howrah, India
No part of the site should be reproduced in any form or by any means, electronically or otherwise, without prior written permission.
Powered by Softsignindia