শ্রীরামকৃষ্ণ (Sri Ramakrishna)

PAGE AT A GLANCE (পৃষ্ঠা একনজরে)  
1) আবির্ভাব ও বাল্যলীলা    5) অন্ত্যলীলা
2) সাধনজীবন 6) সংক্ষিপ্ত জীবনীপঞ্জী
3) তীর্থযাত্রা    7) অমৃতবাণী
4) ভাবপ্রচার ও ধর্ম সংস্থাপন  

 

আবির্ভাব ও বাল্যলীলা

আধুনিক মানুষের সর্বাপেক্ষা মৌলিক প্রশ্ন মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কি তা জানা। শ্রীরামকৃষ্ণ (Sri Ramakrishna) তাঁর জীবনলব্ধ উপাসনার মধ্য দিয়ে সেই মূলগত জিজ্ঞাসার স্পষ্টতর উত্তর নির্দেশ করেছিলেন । মানব জীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বর লাভ আর তারই উপায় সহজ কথায় তুলে ধরেছিলেন তিনি। যত মত তত পথ – বিভিন্ন পথ দিয়েই পৌঁছানো যায় ঈশ্বরের কাছে। ভক্তি, ব্যাকুলতা, ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসাই আসল। ভাবগ্রাহী জনার্দন মন দেখেন। কে কোথায় কোন কাজে পড়ে আছে তা দেখেন না। সব জীবেই তাঁর প্রকাশ। তাই শিবজ্ঞানে জীব সেবার কথা বলেছিলেন। মাতৃপূজারী শ্রীরামকৃষ্ণ ভবতারিণীর পায়ে নিবেদন করেছিলেন জ্ঞান-অজ্ঞান, ভক্তি–অভক্তি, বৈরাগ্য–অবৈরাগ্য, শরীর-মন সর্বস্ব, কিন্তু সত্যকে দিতে পারেননি। অকুণ্ঠ সত্য নিষ্ঠার এই বীজ গদাধরের মধ্যে উপ্ত হয়েছিল বংশ পরম্পরায়। জমিদার রমানন্দ রায়ের নির্দেশ মত মিথ্যা সাক্ষী দিতে রাজী না হওয়ায় হুগলীর দেরেগ্রামের সম্ভ্রান্ত বসত বাটী ও জমি জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল সপরিবার  ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়কে। বন্ধু সুখলাল গোস্বামী খবর পেয়ে হুগলীর কামারপুকুর (Kamarpukur) গ্রামে ক্ষুদিরামকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তীর্থ ভ্রমণে গয়ায় এসে ক্ষুদিরাম এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলেন। গদাধর বিষ্ণু তাঁকে দেখা দিয়ে তাঁর ঘরে পুত্ররূপে আসতে চাইলেন । ক্ষুদিরাম ছিলেন ঈশ্বরগতপ্রাণ। দরিদ্র তিনি, তাঁর ঘরে এলে প্রভুর কত কষ্ট হবে, তা নিবেদন করলেন। 

নারায়ণ কিন্তু হেসে আবার তার ঘরেই আসতে চাইলেন। এদিকে কামারপুকুরে চন্দ্রমণি দেবীরও এক অদ্ভুত দর্শন হয়েছিল। বাড়ির কাছে যুগীদের শিব মন্দিরে গিয়েছিলেন তিনি। অকস্মা‌ৎ এক জ্যোতি শিববিগ্রহ থেকে নির্গত হয়ে প্রবেশ করেছিল তাঁর দেহে। ক্ষুদিরাম ও চন্দ্রমণি, উভয়েরই বিশ্বাস হয়েছিল ভগবান পুত্র রূপে তাঁদের কাছে আসছেন। ১৮৩৬ –এর ১৮ই ফেব্রুয়ারী (৬ই ফাল্গুন, শুক্লা দ্বিতীয়া) কামারপুকুরে ক্ষুদিরামের বাড়ীর ঢেঁকিশালে তাঁর তৃতীয় পুত্র গদাধরের জন্ম হয়েছিল। পাঁচ বছর বয়স থেকে জমিদার ধর্মদাস লাহার নাটমন্দিরের সামনে স্থাপিত পাঠশালায় গদাইয়ে পড়াশুনার সূচনা হয়েছিল। সঙ্গীত, দেব-দেবীর স্তব, যাত্রা অভিনয়, মূর্তি তৈরী, ছবি আঁকায় সে সহজাত পারদর্শী। তবে অঙ্ক, হিসেব তার ভালো লাগে না। মানিকরাজার আমবাগানে বন্ধুদের সাথে গদাই খেলে বেড়ায়। ছয় বছর বয়সে মাঠের আলপথ দিয়ে যাবার সময় একদিন তাঁর চোখ পড়েছিল আকাশের দিকে। কালো কাজল মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। এক ঝাঁক শুভ্র ধবল বক মেঘের কোলে উড়ে যাচ্ছিল সারি বেধে। প্রকৃতির অনাবিল শোভা দর্শনে অতীন্দ্রিয় ভাবসমাধির আবেশে সংজ্ঞা লোপ হয়েছিল বালকের। গদাইয়ের বয়স যখন মাত্র সাত বছর তখন ক্ষুদিরামের মৃত্যু হয়। অকস্মাৎ পিতৃবিয়োগের ঘটনায় গদাধরের মনে যেমন খুব আঘাত  লেগেছিল, তেমনি জীবনের অনিত্যতা সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। ভূতির খাল ও শ্মশান সংলগ্ন বটগাছের তলায় একাকী বালক মগ্ন হয়ে থাকতো গভীর চিন্তা ও ধ্যানে। গ্রামের পাশে পুরী যাওয়ার রাস্তা। সেখানে পান্থশালায় সাধুরা বিশ্রাম নিতেন। তাঁদের সেবা করতে,ধর্মীয় আলোচনা শুনতে খুব ভালো লাগতো গদাইয়ের। একবার গ্রামের মহিলারা কামারপুকুর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে আনুড় গ্রামে যাচ্ছিলেন বিশালাক্ষি দেবীকে পুজো দিতে। গদাই তাঁদের সঙ্গ নিয়েছিল। মধুর কণ্ঠে মায়ের গান করতে করতে যাচ্ছিল সে। দেবীর মহিমা কীর্তন করতে করতে গদাই বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে  মাতৃভাবে তন্ময় হয়ে গিয়েছিল। শেষে মহিলারা মা বিশালাক্ষি দেবীর নাম তার কানে শোনাতে সে স্বাভাবিক হয়েছিল। নয়বছর বয়সে উপনয়নের সময় গদাই জেদ ধরেছিল তার দাইমা ধনী কামারনীকে ভিক্ষে মা করতে হবে, কারণ সে আগেই কথা দিয়ে রেখেছে। প্রচলিত লোকাচারের বিরুদ্ধে গিয়ে সত্যরক্ষায় দৃঢ়মনস্থ বালকের সামনে কারোর কোনো আপত্তি টিকলো না। অন্ত্যজ বর্ণের মানুষের প্রতি ভালোবাসার উ‌ৎস্রোতে কখনোই বাধা হতে পারে নি প্রচলিত জাতিভেদ বা লোকাচার। শিবরাত্রির দিনে পাইনবাড়ীর সামনে যাত্রার আসরে শিবের ভূমিকায় অভিনয় করতে উঠে  ভাব সমাধিতে লীন হয়েছিল গদাধর। লাহাবাবুদের বাড়ীতে পন্ডিতদের সভায় শাস্ত্রবিচারের সময় ছোট বালক সরল কথায় জটিল শাস্ত্র তত্ত্বের মীমাংসা করে দিয়েছিল। পন্ডিতরা তার বিচার ও চিন্তা শক্তিতে অবাক হয়েছিলেন। মাণিকরাজার আমবাগানে বাল্যবন্ধুদের নিয়ে  যাত্রার মহড়ার সময় গদাই যেমন নিজে অভিনয় করতো, তেমনি বন্ধুদেরও শেখাতো। দূর্গাদাস পাইন তার বাড়ীর ভিতর কোন পুরুষ মানুষ ঢুকতে পারে না বলে অহেতুক অহংকার করায় গদাধর একদিন তাঁতি মেয়ের বেশে সবাইকে বোকা বানিয়ে তাদের বাড়ির অন্দর মহলে ঢুকে পড়েছিল।

সাধনজীবন

গদাধরের বয়স যখন সতের বছর, অগ্রজ রামকুমার তাকে কোলকাতায় (সম্ভবত প্রথমে ঝামাপুকুরে) নিজের টোলে নিয়ে এসেছিলেন। গদাধর কিন্তু স্পষ্ট জানিয়েছিলো সে চালকলা বাঁধা বিদ্যা শিখবে না। সে এমন বিদ্যা শিখতে চায়, যাতে জ্ঞানের উদয় হয়ে মানুষ বাস্তবিক কৃতার্থ হয়। ১৮৫৫ র ৩১শে মে স্নানযাত্রার দিন রাণী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে (Dakshineswar) ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন। কিছুদিন পরে মা কালীকে সাজাবার কাজ শ্রীরামকৃষ্ণের উপর ন্যস্ত হল। জন্মাষ্টমীর পরের দিন বিষ্ণু বিগ্রহের পা ভেঙে গেলে বিগ্রহটির কি ব্যবস্থা করা হবে তা নিয়ে রাসমণি ও তাঁর জামাতা মথুরবাবু চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেছিলেন, রাণীর কোন জামাইয়ের পা ভেঙে গেলে তাকে কি ত্যাগ করা হবে, না চিকি‌ৎসা করে পা সারাবার চেষ্টা করা হবে। ভগবানকে নিজের মত, আপনজন ভেবে ভালোবাসার, সেবা করার পথ দেখিয়ে ছিলেন তিনি। রাসমণী ও মথুরানাথের আগ্রহে রাধা গোবিন্দের পূজার ভার নিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। কেনারাম ভট্টাচার্যের কাছে গ্রহণ করেছিলেন শক্তি মন্ত্র। অগ্রজ রামকুমারের স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় মাঝে মাঝে কালীপুজোর ভার পড়তে থাকলো তাঁর ওপর। ক্রমে স্থায়ী ভাবে কালীপুজোর কাজ গ্রহণ করেছিলেন। মায়ের পুজোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দর্শন লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে তাঁকে ডাকতে শুরু করলেন। পুজোর সময় ছাড়াও অন্য সময় সর্বদা মায়ের চিন্তা করতেন। গভীর রাতে পঞ্চবটীর গহন জঙ্গলে মাতৃধ্যানে নিমগ্ন হয়ে থাকতেন। ভালোভাবে খাওয়া নেই, ঘুম নেই, দিনরাত শুধু মায়ের কথা ভাবা আর কেঁদে কেঁদে বলা ‘মা দেখা দে’। সন্ধ্যা হলে গঙ্গার ধারে মাটিতেই মুখ ঘষে কাঁদেন আর বলেন ‘মা আর একটা দিন চলে গেল তোর দেখা পেলাম না’। তাঁর ভাবস্থ অবস্থা দেখে অসুস্থ সন্দেহে কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদকে চিকি‌ৎসার জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর প্রয়াস নিষ্ফল হয়েছিল। মাতৃসাধক তন্ময় হয়ে থাকেন মাতৃ বন্দনায়। সংসারের ভোগ সুখ নাম যশ টাকা কড়ি কিছুই তিনি চান না। চান শুধু মায়ের দর্শন। অবশেষে একদিন এ জীবনে মায়ের দেখা আর পাবেন না ভেবে জীবন ত্যাগের জন্য কালী ঘরের বলিদানের খাঁড়ায় নিজের জীবন বলি দিতে উদ্যত হলে, নিজেকে জ্যোতির সমুদ্রে  হারিয়ে ফেলেন। ঘর, দ্বার, মন্দির সব যেন কোথায় লুপ্ত হয়েছিল। কোথাও যেন আর কিছু নেই। এক অসীম, অনন্ত চেতন জ্যোতিঃ সমুদ্র। চারদিক থেকে তার উজ্জ্বল ঊর্মিমালা তর্জন গর্জন করে যখন তাঁর উপর এসে পড়েছিল, তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। মায়ের অপরূপ দর্শনে শ্রীরামকৃষ্ণ ধন্য হলেন। এখন তিনি সব সময়ে মাকে কাছে পেতে চান। মার সঙ্গে কথা বলেন। কেবল মন্দিরেই নয় মা কালীকে তিনি দেখতে পান নিজের ভিতরে, সব মানুষে, সব প্রাণীতেই, সর্বভূতে। পুজোর সময়ে মন্দিরে বেড়াল ঢুকলে তার ভেতর মা কালীকে দেখতে পেয়ে ভোগের খাবার তাকে খাইয়ে দিয়েছিলেন। প্রথাগত পুজো তিনি আর বেশিদিন করতে পারলেন না। বৈধীভক্তি যখন রাগভক্তিতে পরিণত হয়, তখন প্রথাগত বিধিআচারপূর্ণ পূজাপদ্ধতি সাধক আর অনুসরণ করতে পারেন না। শ্রীরামকৃষ্ণ পরবর্তী কালে বলেছিলেন, রাগভক্তি লাভ হলে সাধকের ঈশ্বরদর্শন লাভ হয়। পুত্রের ভাবোন্মত্ত অবস্থা শ্রবণে মা চন্দ্রমণি দেবী বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। ছেলে কামারপুকুরে ফিরলে তাঁর বিবাহের আয়োজনের চেষ্টা করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং পাত্রীর সন্ধান দিয়েছিলেন জয়রামবাটীর (Jayrambati) মুখার্জীদের বাড়িতে। জয়রামবাটীর রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাসুন্দরীর কন্যা সারদামণির বয়স তখন প্রায় ছয় ব‌ৎসর। তার সঙ্গে ১৮৫৯ সালের মে মাসে প্রায় চব্বিশ বছরের যুবক শ্রীরামকৃষ্ণের বিবাহ হয়ে গেল। দক্ষিণেশ্বরে প্রত্যাবর্তনের পর শ্রীরামকৃষ্ণ পুনরায় দিব্যোন্মত্তভাবে সাধনায় নিমগ্ন হয়েছিলেন।  ১৮৬১ সালে যোগেশ্বরী ভৈরবী ব্রাহ্মণীর দক্ষিণেশ্বরে আগমনের পরে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর নির্দেশ মত তন্ত্রসাধনার প্রথা অনুসারে সাধনা শুরু করেছিলেন। ঠাকুরের অভূতপূর্ব ঈশ্বর অনুরাগ, ব্যকুলতা ও উন্মত্ততা দেখে সাধারণ মানুষেরা অনেক সময় শারীরিক ব্যাধি বলে মনে করতেন। কখনও তার গায়ে প্রচন্ড জ্বালা করতো। কখনও বা খাওয়ার পরেও হঠা‌ৎ অস্বাভাবিক রকমের খিদে পেত। পূর্ববঙ্গীয় এক বিচক্ষণ চিকি‌ৎসক এই শারীরিক লক্ষণসমূহকে যোগজ ব্যাধি বলে চিহ্নিত করেছিলেন। ভৈরবী ব্রাহ্মণী কিন্তু ঠাকুরের বাহ্যিক পরিবর্তনগুলিকে চিনতে পেরেছিলেন। এগুলি যে কোন রোগ নয়, সাধকের বিশেষ অবস্থার বাহ্যিক লক্ষণ, তা তিনি বুঝেছিলেন। ফুলের মালা পরিধান করলে, গায়ে চন্দনের প্রলেপ দিলে যে এই যন্ত্রণার উপশম হবে, তাও বুঝিয়ে বলেছিলেন। শ্রীমতি রাধা থেকে মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য পর্যন্ত যোগী আচার্যগণের জীবনে আধ্যাত্মিক অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে অনুরূপ শারীরিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল- ভক্তিগ্রন্থসমূহ ও শাস্ত্রজ্ঞানসমূহ উদ্ধৃত করে ভৈরবী তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। মথুরবাবু সে কালের বিখ্যাত পন্ডিত বৈষ্ণবচরণকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরে। যে প্রধান উনিশটি ভাব বা অবস্থার সম্মিলনকে ভক্তিশাস্ত্রে মহাভাব বলা হয়, তা কেবল শ্রীরাধিকা ও শ্রীচৈতন্য দেবের জীবনেই দেখা গিয়েছিল। বৈষ্ণবচরণ সেই সব লক্ষণগুলি দেখতে পেয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে। শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসে তান্ত্রিক সাধক গৌরী পন্ডিতের অহংকার খর্ব হয়েছিল। তিনি ঠাকুরকে চিনেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বররূপে ও ঈশ্বরলাভের জন্য সংসার ত্যাগ করেছিলেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যখন যেভাবে সাধনা করে সিদ্ধ হয়েছিলেন, তখন সেই ভাবের সাধককূল তাঁর কাছে যেন স্বতঃপ্রেরিত হয়ে এসেছিলেন। সেই ভাবের পূর্ণ আদর্শ ঠাকুরের মধ্যে অবলোকন করে, তাঁর সহায়তা লাভে ধন্য হয়েছিলেন। ঈশ্বরের অবতার রূপে চিনে তাঁর পাদপদ্মে সমর্পণ করেছিলেন হৃদয়ের ভক্তি ও প্রীতি। বৈষ্ণব সাধনায় গুরু উপদিষ্ট প্রণালী অবলম্বন করে সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর ভাবে সাধনা করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বিশেষ সাধনপথ অনুসরণ করে তিনি সখীভাবে নারীবেশে  অবস্থান করেছিলেন ও জানবাজারে দুর্গাপূজার সময়ে নারীরূপে দেবীকে চামরব্যাঞ্জন করেছিলেন। জটাধারী দক্ষিণেশ্বরে আসলে তাঁর কাছে রামমন্ত্রে দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণর সঙ্গে জটাধারীর অতি আদরের বিগ্রহ রামলালার আন্তরিক যোগ উপলব্ধি করে বিদায়কালে জটাধারী রামলালের বিগ্রহকে ঠাকুরের কাছে রেখে বিদায় গ্রহণ করেছিলেন। রাধারাণীর উপাসনান্তে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমতির দর্শন লাভ করেছিলেন। বেদান্তবাদী সন্ন্যাসী তোতাপুরী  দক্ষিণেশ্বরে আসলে (সম্ভবত ১৮৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে)  শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন ও অদ্বৈতবেদান্ত সাধনে ডুব দিয়েছিলেন। ছয় মাস অবস্থান করেছিলেন অদ্বৈত ভূমিতে। সুফিসাধক গোবিন্দ রায়ের নির্দেশিত পথে তিনি ইসলাম মতে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে(১৮৭৩ এ) যদুনাথ মল্লিকের বাগানবাড়িতে তিনি মেরিমাতার কোলে যীশুখ্রীষ্টের চিত্র বিশেষ ভাবে দর্শন করে যীশু প্রদর্শিত ধর্মভাবে  তিনদিন অবস্থান করেছিলেন ও নিজ শরীরে যীশুর বিলীন হওয়া অনুভব করেছিলেন। গভীর সাধনজীবনের মধ্যেও গর্ভধারিণীর প্রতি কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি শ্রীরামকৃষ্ণ। নহবতে থাকাকালীন মায়ের সাধ্যমত সেবা করেছিলেন ও মথুরবাবুর সহায়তায় চন্দ্রমণি দেবীকে সঙ্গে নিয়ে কাশী ও প্রয়াগতীর্থ ভ্রমণ করে আসেন।

 তীর্থযাত্রা

দ্বিতীয়বার তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে দেওঘরে পৌঁছে মথুরবাবুকে অনুরোধ করেছিলেন একদিন দরিদ্রের ভোজন ও বস্ত্রদানের ব্যবস্থার জন্য। কাশীতে গিয়ে দেখা হয়েছিল ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে। তাঁকে সাক্ষা‌ৎ শিবরূপে দেখে পায়েসান্ন প্রদান করেছিলেন। প্রয়াগে ত্রিরাত্রি যাপন করে কাশীতে ফিরে এসেছিলেন। সেখানে যোগেশ্বরী ব্রাহ্মণীর সাক্ষা‌ৎলাভ হয়েছিল। মণিকর্ণিকার ঘাটে জন্মান্তর সংস্কারবন্ধন মুক্তকারী শিব ও মহাকালীর দিব্যমূর্তি দর্শন করেছিলেন। দীপান্বিতা অমাবস্যার দিন দেবী অন্নপূর্ণার স্বর্ণপ্রতিমা দর্শনে মোহিত হয়েছিলেন। এরপর বৃন্দাবনে গিয়ে নিধুবন, রাধাকুন্ড, শ্যামকুন্ড ও গিরি গোবর্ধন দর্শন করে বৈষ্ণবের ভেক গ্রহণ করেছিলেন । বাঁকাবিহারী দর্শনে আত্মহারা হয়ে আলিঙ্গন করতে গিয়েছিলেন । নিধুবনে সিদ্ধ তপস্বিনী গঙ্গামার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁর কাছেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। অবশেষে দক্ষিণেশ্বরে মাতা চন্দ্রমণি দেবীর অবস্থান করছেন সে কথা স্মরণ হওয়াতে মত বদল করেছিলেন। রাখাল বালকদের গরু  নিয়ে যমুনা পার হতে দেখে তাঁর শ্রীকৃষ্ণের উদ্দীপন হয়েছিল ও পারিপার্শ্বিককে অতিক্রম করে তাঁর সমগ্র সত্ত্বা  শ্রীকৃষ্ণের অন্বেষণে ধাবিত হয়েছিল। পরে মথুরবাবুর সঙ্গে গিয়েছিলেন রাণাঘাট, কলাইঘাট, কালনা ও নবদ্বীপে। নবদ্বীপে নৌকায় লাভ করেছিলেন শ্রীচৈতন্যের দিব্যদর্শন।

 

ভাবপ্রচার ও ধর্ম সংস্থাপন

তীব্র পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, ধীশক্তি ও সাধনালব্ধ দিব্য ভাবভূমির আঙ্গিকে তীর্থদর্শনের অভিজ্ঞতা শ্রীরামকৃষ্ণের সামনে তুলে ধরেছিল তৎকালীন সমাজের প্রকৃত পটভূমি। ধর্মহীনতা, প্রচলিত ধর্মমতগুলির একদেশিতা, বিভিন্ন ধর্মীয় মতের একই চরমলক্ষ্য সম্পর্কে আচার্যদের অনভিজ্ঞতা, দেশ-কাল-পাত্র বিবেচনা অনুসারে ধর্ম পথ প্রদর্শনের  অভাব তিনি বিশেষভাবে অনুভব করেছিলেন। সব ধর্মই সত্য- যত মত তত পথ – একদেশিত্বহীন বিদ্বেষশূন্য তাঁর এই ভাব যে এক অদৃষ্টপূর্ব আদর্শ তা তিনি অনুভব করেছিলেন। বুঝেছিলেন জগদম্বার নির্দিষ্ট ব্যক্তি রূপে তাঁকেই ঐ ভাব শিক্ষা দিতে হবে। আগে দীন সাধক বা বালক ভাবই ঠাকুরের মনের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল। গুরুভাবের প্রকাশ অকস্মা‌ৎ, স্বল্প সময়ের জন্যই হত। এখন তার বিপরীত, গুরুভাবেই অধিককাল অবস্থিতি দেখা যেতে লাগল। ফলহারিণী কালীপুজোর রাতে সারদাদেবীকে জগদম্বা রূপে (ষোড়শী বা ত্রিপুরা সুন্দরী জ্ঞানে) পূজান্তে তাঁর পদপ্রান্তে সাধনার ফল ও জপমালা সমর্পণ করেছিলেন। দিব্যভাবের আবেগে ঠাকুর এখন ব্যকুলচিত্তে কুঠির উপরের ছাদে উঠে, ভক্তদেরকে ‘তোরা সব কে কোথায় আছিস, আয় রে’ ,বলে কেঁদে কেঁদে ডেকেছিলেন। ১৮৭৫ এর ১৫ই মার্চ বেলঘরিয়ার জয়গোপাল সেনের বাগানবাড়ি ‘তপোবন’-এ ত‌ৎকালীন ব্রাহ্মসমাজের প্রধান ভক্তপ্রবর কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষা‌ৎ হয়েছিল। তাঁর দিব্যদৃষ্টি ও উপদেশের আকর্ষণে আত্মজিজ্ঞাসু, ধর্মপিপাসু বহু মানুষ দক্ষিণেশ্বরে আসতে শুরু করেছিলেন। একদিকে তৎকালীন সমাজের প্রথিতযশা ব্যক্তি বিশেষ কেশবচন্দ্র সেন, প্রতাপ মজুমদার, রামচন্দ্র দত্ত, মনমোহন মিত্র, গোপাল মিত্র, বলরাম বসু, মহেন্দ্র নাথ গুপ্ত (শ্রীম), ত্রৈলোক্য সান্যাল, বিশ্বনাথ উপাধ্যায় (কাপ্তেন), বেনী পাল, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, অধর সেন, যদু মল্লিক, গিরীশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ গৃহীভক্তগণ, অন্যদিকে ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৩ এই সময় কালে রাখ্‌তু রাম (উত্তরকালের স্বামী অদ্ভুদানন্দ), রাখালচন্দ্র ঘোষ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ), তারকনাথ ঘোষাল (স্বামী শিবানন্দ), নরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ), যোগীন্দ্রনাথ (স্বামী যোগানন্দ), নিত্য নিরঞ্জন (স্বামী নিরঞ্জনানন্দ), বাবুরাম (স্বামী প্রেমানন্দ), শর‌ৎচন্দ্র চক্রবর্ত্তী (স্বামী সারদানন্দ), শশিভূষণ চক্রবর্ত্তী (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ), কালীপ্রসাদ চন্দ্র (স্বামী অভেদানন্দ), হরিপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় (স্বামী বিজ্ঞানানন্দ) প্রমুখ উত্তরকালের ত্যাগী সন্ন্যাসী সন্তানেরা একে একে সমবেত হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের পদপ্রান্তে। অঘোরমণি দেবী (গোপালের মা), গৌরী-মা, যোগীন্দ্রমোহিনী বিশ্বাস (যোগীন মা), গোলাপসুন্দরী দেবী (গোলাপ মা), শ্যামাসুন্দরী দেবী (ভ্রাতুষ্পুত্রী), লক্ষীমণি দেবী (লক্ষী দিদি) প্রমুখ মহিলা ভক্তগণ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে পেয়েছিলেন আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ নির্দেশ। ভক্তব‌ৎসল ঠাকুর অপার করুণায় মানুষের মুক্তির পথ প্রদর্শন করেছিলেন। যে যে অবস্থায় থাকুক না কেন, সে অবস্থা থেকে ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা ও অনুরাগ বৃদ্ধির পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। সহজ সরল কথায়, উপমার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন জটিল তত্ত্বকে। আবার সাধারণ মানুষ নিত্যদিনের জাগতিক ব্যস্ততার মধ্যে কি ভাবে তাঁর নাম নেবে তাও তিনি বলেছিলেন। ত্যাগী ভক্তদের যেমন দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ ত্যাগের আদর্শ, তেমনি গৃহী ভক্তদের বলেছিলেন সংসারের বিশ মণ বোঝা ঠেলে ঈশ্বরের দিকে এগোনোর সহজ পন্থা।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে দয়ানন্দ সরস্বতী, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ সমকালীন মনীষিদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষা‌ৎ হয়েছে। ঈশ্বরের জন্য সর্বস্বত্যাগ করাই ঠাকুরের কাছে ব্যক্তিগত চরিত্র ও অনুষ্ঠানের পরিমাপক ছিল। মান আর হুঁশের সমন্বয়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার কথা বলেছিলেন তিনি। তা বলে শুঁটকে সাধু বা একঘেয়ে ভাবে তাঁর পছন্দ ছিল না। বৈচিত্র্যপূর্ণ ভগবত উপাসনার রসাস্বাদন করতে পছন্দ করতেন তিনি। কখনও কীর্তনানন্দে গরগর মাতোয়ারা। কখনো ভক্তকন্ঠে প্রার্থনা সঙ্গীত শ্রবণে সমাধিস্থ। কখনও মধুর কন্ঠে হরিনাম করেছেন। মেতে উঠেছেন সংকীর্তন ও নৃত্যে। পানিহাটির মহো‌ৎসবে রাজপথে সংকীর্তন দলের সঙ্গে নৃত্যে যোগ দিয়েছেন।  দুর্গো‌ৎসবে গেছেন অধর সেনের বাড়িতে। যদু মল্লিকের বাড়িতে সিংহবাহিনী দেবী মূর্তির সম্মুখে সমাধিস্থ হয়ে পড়েছেন। গেছেন ব্রাহ্ম উ‌ৎসবে। অসুস্থ কেশব সেনকে দেখতে গেছেন কমলকুটিরে। গেছেন কালীঘাটে দেবী দর্শনে। গেছেন ব্রাহ্ম সমাজের নিরাকারবাদী  সাধকদের উপাসনাস্থলে। কখনো স্টার থিয়েটারে নাটক দেখতে। কখনো ইডেন গার্ডেন্স , ফোর্ট উইলিয়াম, গড়ের মাঠ, এশিয়াটিক সোসাইটি বা চিড়িয়াখানায়। কত ভক্তের গৃহ তাঁর পদধূলিতে ধন্য হয়েছে। যখন সেখানে তিনি গিয়েছেন, তাঁকে ঘিরে আনন্দের হাট বসেছে।

অন্ত্যলীলা

গলায় রোগ হওয়ায় ও রোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৮৮৫-র ২৬শে সেপ্টেম্বর দক্ষিণেশ্বর থেকে তাঁকে কোলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়েছিল চিকি‌ৎসার সুবিধার্থে। বাগবাজারে দুর্গাচরণ মুখর্জী ষ্ট্রীটের বাসাটি পছন্দ না হওয়ায় বলরাম বসুর গৃহে চলে এসেছিলেন। ২রা অক্টোবর শ্যামপুকুরের বাসাবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ঐ বাড়িতে কালীপুজোর দিনে ধরা দিয়েছিলেন ভক্তদের কাছে মা কালীরূপে, গ্রহণ করেছিলেন পুষ্পাঞ্জলী। প্রাকৃতিক উন্মুক্ত পরিবেশে চিকি‌ৎসার সুবিধার সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ১৮৫৫-র ১১ই ডিসেম্বর কাশীপুরের গোপাল ঘোষের উদ্যানবাটীতে (Cossipore Udyanbati)  নিয়ে আসা হয়েছিল তাঁকে। উদ্যানবাটীতে ১৮৮৬-র ১লা জানুয়ারী কল্পতরুরূপে গৃহীভক্তদের চৈতন্যলাভের আশীর্বাণী করেছিলেন। তীর্থযাত্রা শেষে বুড়ো গোপালের (স্বামী অদ্বৈতানন্দ)  আনা গেরুয়া ও রুদ্রাক্ষের মালা এগার জন ত্যাগী শিষ্যকে তুলে দিয়ে তাঁদের চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন  সন্ন্যাসী সন্তানরূপে। মহাসমাধির পূর্বলগ্নে ভাবী কর্মযজ্ঞের দায়িত্বভার ন্যস্ত করেছিলেন সুনিপুণ দক্ষতায়। নরেন্দ্রনাথকে লোকশিক্ষাদানের চাপরাস লিখে দিয়েছিলেন। সারদাদেবীকে বলেছিলেন, ‘কোলকাতার লোকগুলো অন্ধকারে কিলবিল করছে, তাদের তুমি দেখো’। নরেন্দ্রনাথের  নির্বিকল্প সমাধিলাভের পর বলেছিলেন, ‘ঘরের চাবি আমার হাতে রইল। তুই এখন আমার কাজ কর। পরে সময় হলে আমি চাবি খুলে দেবো’। মহাসমাধির কয়েকদিন আগে নরেন্দ্রনাথকে সামনে বসিয়ে তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ঠাকুর সমাধিস্থ। নরেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ঠাকুরের দেহ থেকে সূক্ষ্ম তেজরশ্মি, তড়ি‌ৎকম্পনের মত তাঁর শরীরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। সমাধিভঙ্গ হলে অশ্রু বিসর্জন করে নরেন্দ্রনাথকে বলেছিলেন,‘আজ যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম, তুই এই শক্তিতে জগতের কাজ করবি। কাজ শেষ হলে ফিরে যাবি।’ ঠাকুর কি সত্যিই অবতার, এই সংশয় তখনও সম্পূর্ণ নিরসন হয়নি যুক্তিবাদী নরেন্দ্রনাথের হৃদয় থেকে। অন্তর্যামী ঠাকুর তা উপলব্ধি করে বলেছিলেন, ‘সত্যি সত্যি বলছি, যে রাম যে কৃষ্ণ সেই ইদানিং এই শরীরে রামকৃষ্ণ – তবে তোর বেদান্তের দিক দিয়ে নয়।’ যোগীনকে পঞ্জিকা থেকে কয়েকদিনের তিথি নক্ষত্র পাঠের নির্দেশ দিয়েছিলেন। শ্রাবণ সংক্রান্তির দিনটি বিস্তারিত শোনার পর পাঠ থামিয়ে দিয়েছিলেন। সারদাদেবীর থেকে বিদায়গ্রহণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘মনে হচ্ছে জলের মধ্য দিয়ে অনেকদূর চলে যাচ্ছি।’ ১৮৮৬-র ১৬ই আগষ্ট (৩১শে শ্রাবণ, ১২৯৩) রাত্রি ১টা ২ মিনিটে শ্রীরামকৃষ্ণ মহাসমাধির মধ্য দিয়ে মর্ত্যলীলা সংবরণ করেছিলেন। নিজেই তিনি বলেছিলেন, একদিন তাঁর ছবি ঘরে ঘরে পুজো করা হবে। আজ সত্যিই সারা পৃথিবীর বহু মানুষ শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশকে সামনে রেখে খুঁজে পাচ্ছে পরম আশ্রয়স্থল, শান্তির ঠিকানা।।

 

সংক্ষিপ্ত জীবনীপঞ্জী

১৮৩৬ –এর ১৮ই ফেব্রুয়ারী (৬ই ফাল্গুন, শুক্লা দ্বিতীয়া) – কামারপুকুরে ক্ষুদিরামের বাড়ীর ঢেকিশালে তাঁর তৃতীয় পুত্র তথা চতুর্থ সন্তান গদাধরের জন্ম ।

১৮৪২ (আনুমানিক) -কালো মেঘের কোলে সাদা বকের সারি দেখে অতীন্দ্রিয় আবেশে সংজ্ঞা লোপ ( প্রথম ভাব সমাধি), বিজয়া দশমীর রাতে ক্ষুদিরামের মৃত্যু।

১৮৫৩ – কলকাতায় প্রথম আগমন।

১৮৫৫ র ৩১শে মে – রাণী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে কালী মন্দিরে বেশকারী রূপে, পরে রাধাগোবিন্দের পূজারী ও শেষে কালী মন্দিরের পূজারী কাজে নিযুক্ত।

১৮৫৯ সালের মে মাস – শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সারদামণির বিবাহ ।

১৮৬১ - যোগেশ্বরী ভৈরবী ব্রাহ্মণীর দক্ষিণেশ্বরে আগমনের পরে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর নির্দেশ মত তন্ত্রসাধনার প্রথা অনুসারে সাধনা শুরু করেছিলেন।

১৮৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে (সম্ভবত) –বেদান্তবাদী সন্ন্যাসী তোতাপুরী দক্ষিণেশ্বরে আসলে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন ও অদ্বৈতবেদান্ত সাধনে ডুব দিয়েছিলেন।

১৮৭২-এর ৫ই জুন - ফলহারিণী কালীপুজোর রাতে সারদাদেবীকে জগদম্বা রূপে (ষোড়শী বা ত্রিপুরাসুন্দরী জ্ঞানে) পূজান্তে তাঁর পদপ্রান্তে সাধনার ফল ও জপমালা সমর্পণ করেছিলেন।

১৮৭৫ এর ১৫ই মার্চ - বেলঘরিয়ার জয়গোপাল সেনের বাগানবাড়িতে ব্রাহ্মসমাজের  ভক্তপ্রবর কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে  প্রথম সাক্ষা‌ৎ।

১৮৭৯ থেকে ১৮৮৩ - উত্তরকালের ত্যাগী সন্ন্যাসী সন্তানেরা একে একে সমবেত হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের পদপ্রান্তে।

১৮৮৫-র ২৬ শে সেপ্টেম্বর – চিকিৎসার সুবিধার্থে দক্ষিণেশ্বর থেকে ঠাকুরকে কলকাতায় আনা হয়েছিল।

১৮৮৫-র ১১ই ডিসেম্বর – ঠাকুরকে কাশীপুরে গোপাল ঘোষের উদ্যানবাটীতে নিয়ে আসা হয়েছিল ।

১৮৮৬-র ১লা জানুয়ারী – ঠাকুর কল্পতরু রূপে গৃহীভক্তদের চৈতন্যলাভের আশীর্বাণী করেছিলেন।

১৮৮৬-র ১৬ই আগষ্ট (৩১শে শ্রাবণ, বঙ্গাব্দ ১২৯৩) রাত্রি ১টা ২ মিনিটে –মহাসমাধি।

 

অমৃতবাণী

অভ্যাস

চাঁদা মামা যেমন সব শিশুর মামা, তেমনি ঈশ্বর সকলেরই আপনার; তাঁকে ডাকবার সকলেরই অধিকার আছে। যে ডাকবে, তিনি তাকেই দেখা দিয়ে কৃতার্থ করবেন।

সর্বদা তাঁর নাম করতে হয়। কাজের সময় মনটা তাঁর কাছে ফেলে রাখতে হয়।  

অভ্যাস দ্বারা মনে অসাধারণ শক্তি এসে পড়ে, তখন ইন্দ্রিয় সংযম করতে – কাম, ক্রোধ বশ করতে – কষ্ট হয় না।

ঈশ্বরের নামগুণগান সর্বদা করতে হয়। আর সৎসঙ্গ- ঈশ্বরের ভক্ত বা সাধু, এঁদের কাছে মাঝে মাঝে যেতে হয়।

রোজ রোজ তাঁকে ডাকা অভ্যাস করলে ব্যাকুলতা আসে।

দৈনন্দিন জীবনচর্যা

নিষ্কামভাবে কর্ম করতে পারলে চিত্তশুদ্ধি হবে, ঈশ্বরের উপর তোমার ভালবাসা আসবে। ভালবাসা এলেই তাঁকে লাভ করতে পারবে।

মনকে যদি কুসঙ্গে রাখ, তো সেইরকম কথাবার্তা, চিন্তা হয়ে যাবে। যদি ভক্তের সঙ্গে রাখ, ঈশ্বরচিন্তা, হরিকথা- এই সব হবে। 

সাধুসঙ্গ সর্বদা দরকার, সাধু ঈশ্বরের সঙ্গে আলাপ করে দেন।

সত্যকথা কলির তপস্যা। কলিতে অন্য তপস্যা কঠিন। সত্যকে আঁট করে ধরে থাকলে তবে ভগবান লাভ হয়। যার সত্যনিষ্ঠা আছে, মা তার কথা কখনও মিথ্যা হতে দেন না।

যারা বিষয়কর্ম করে – আফিসের কাজ কি ব্যাবসা- তাদেরও সত্যেতে থাকা উচিত। সত্যকথা কলির তপস্যা।

ধ্যান করবে মনে, কোণে আর বনে। ঈশ্বর চিন্তা যত লোকে টের না পায়, ততই ভাল।

সকলকে ভালবাসতে হয়। কেউ পর নয়। সর্বভূতেই সেই হরি আছেন। তিনি ছাড়া কিছুই নাই।

যদি কেউ গাইতে, বাজাতে, নাচতে, কি একটা কোন বিদ্যাতে ভাল হয়, সে যদি চেষ্টা করে, শীঘ্রই ঈশ্বরলাভ করতে পারে।

সহ্যগুণের চেয়ে আর গুণ নেই। যে সয় সে রয়। যে না সয় সে নাশ হয়। সকল বর্ণের মধ্যে ‘স’ তিনটি- শ,ষ,স। সকলেরই সহ্যগুণ থাকা চাই।

ভগবান মন দেখেন। কে কি কাজে আছে, কে কোথায় পড়ে আছে, তা দেখেন না। ‘ভাবগ্রাহী জনার্দন।’

 

প্রার্থনা

তাঁকে ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা করতে হয়। আন্তরিক হলে তিনি প্রার্থনা শুনবেনই শুনবেন।

ত্যাগ করতে হলে ঈশ্বরের কাছে পুরুষকারের জন্য প্রার্থনা করতে হয়। যা মিথ্যা বলে বোধ হবে তা তৎক্ষণাৎ ত্যাগ।

কারুকে নিন্দা করো না, পোকাটিরও না। নারায়ণই এই সব রূপ ধরে রয়েছেন। যেমন ভক্তি প্রার্থনা করবে তেমনি এটাও বলবে- ‘যেন কারও নিন্দা না করি।’

তাঁর কাছে ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা কর যাতে শুভযোগ ঘটে, অনুকূল হাওয়া বয়। ব্যাকুল হয়ে ডাকলে তিনি সব সুযোগ করে দেবেন।

 

ত্যাগ

সাধুর ষোল আনা ত্যাগ দেখলে অন্য লোকে ত্যাগ করতে শিখবে। তা না হলে তারাও পড়ে যাবে। সন্ন্যাসী জগদ্গুরু।

 

শ্রদ্ধা

সব মতকে নমস্কার করবে, তবে একটি আছে নিষ্ঠাভক্তি। সবাইকে প্রণাম করবে বটে, কিন্তু একটির উপরে প্রাণ-ঢালা ভালবাসার নাম নিষ্ঠা।

যে কেবল বলে ‘আমি পাপী’ ‘আমি পাপী’ সেই পড়ে যায়। বরং বলতে হয়, আমি তাঁর নাম করেছি, আমার এখনও পাপ থাকবে! আমার আবার পাপ কি। বন্ধন কি?

 

Ramakrishna Mission Vivekananda University
Belur Math, Howrah, India
No part of the site should be reproduced in any form or by any means, electronically or otherwise, without prior written permission.
Powered by Softsignindia